
শেরপুর (বগুড়া) সংবাদদাতা: বগুড়ার শেরপুরে সারের জন্য কৃষকের ছুটোছুটি, কৃষক সরকারি দামে পাচ্ছে না সার। সরকারি নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে টিএসপি ও ডিএপি সার নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। তাদের অভিযোগ, বস্তাপ্রতি ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়া হলেও অনেক ক্ষেত্রে দেওয়া হচ্ছে না দোকানের মেমো। একই সঙ্গে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগও করেছেন কৃষকরা। সরেজমিনে উপজেলার কুসুম্বি ইউনিয়নের খিকিন্দা ও উত্তার পেচুল, মির্জাপুর ইউনিয়নের দরিমুন্দ, তালতা ও শাহবন্দেগী ইউনিয়নের শেরুয়া, গাড়িদহ ইউনিয়নের মিচকীপাড়া এবং খামারকান্দি ইউনিয়নের হুসনাবাদসহ বিভিন্ন এলাকায় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে এসব অভিযোগ পাওয়া গেছে। কৃষকরা জানান, চাষাবাদের মৌসুমে প্রয়োজন অনুযায়ী সার না পাওয়ায় তারা দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। বেশি দাম দিতে রাজি থাকলে কোথাও কোথাও সার পাওয়া গেলেও সরকারি দামে সার চাইলে ‘সার শেষ’ বলে জানানো হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের। উত্তর পেুচুল গ্রামের কৃষক জেল হক বলেন, তিনি ১ থেকে ১১ বিঘা জমিতে চাষ করছেন। সময়মতো সার না পেলে ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তার অভিযোগ, পাইকারি থেকে খুচরা—কোথাও পর্যাপ্ত ডিএপি সার পাওয়া যাচ্ছে না। কৃষক হাফিজুল ইসলাম ৩ বিঘা, আমজাদ হোসেন ৪ বিঘা, ফরিদুল হক ৬ বিঘা, আবু সাঈদ ৫ বিঘা, কাশিয়াবালা গ্রামের বাচ্চু শেখ ২ বিঘা ও বাবলু ৩ বিঘা জমিতে চাষাবাদ করছেন। তারাও বাজারে সার সংকট ও বাড়তি দাম নেওয়ার অভিযোগ করেছেন। কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি নির্ধারিত হিসাবে প্রতি বস্তা টিএসপি সারের দাম ১ হাজার ৩৫০ টাকা। অথচ তাদের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত। এতে বস্তাপ্রতি সর্বোচ্চ ৪৫০ টাকা পর্যন্ত বেশি দিতে হচ্ছে। একইভাবে ১ হাজার ৫০ টাকা নির্ধারিত দামের ডিএপি সার ১ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। খিকিন্দা গ্রামের কৃষক ফারুক হোসেন, আশরাফ হোসেন, নুরনবী, গাড়িদহ ইউনিয়নের মিচকীপাড়ার কৃষক ফরিদ এবং খামারকান্দি ইউনিয়নের হুসনাবাদ গ্রামের কৃষক আলমও একই ধরনের অভিযোগ করেন। কাশিয়াবালা গ্রামের কৃষক বাচ্চু শেখ বলেন, প্রতি বছরই সারের সময় ডিলারদের এমন সিন্ডিকেটের কারণে প্রকৃত কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হন। কৃষি অফিসে অভিযোগ করেও অনেক সময় প্রতিকার পাওয়া যায় না।’ কৃষকদের আরও অভিযোগ, সরকারিভাবে দেশে সারের ঘাটতি নেই এবং পর্যাপ্ত বরাদ্দ রয়েছে বলা হলেও ডিলারের দোকানে গেলে অনেক সময় ‘সার শেষ’ বলে জানানো হচ্ছে। কিন্তু বেশি দাম দিতে রাজি হলে একই সার পাওয়া যাচ্ছে বলে দাবি তাদের। এদিকে নাম প্রকাশের অনিচ্ছুল একাধিক খুচরা সার বিক্রেতারা বলেন, সাধারণত বিসিআইসি ও বিএডিসি ডিলারদের কাছ থেকে সার সংগ্রহ করে খুচরা ব্যবসায়ীরা কৃষকদের কাছে বিক্রি করেন। তাদের অভিযোগ, বস্তা প্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা অতিরিক্ত দামে সার কিনতে হচ্ছে এবং পর্যাপ্ত সরবরাহও পাওয়া যাচ্ছে না। অতিরিক্ত দামে সার কেনা হলেও মেমোতে সরকারি মূল্য দেখানো হচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেন। তবে ডিলারদের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। ডিলার শফিকুল ইসলাম শিরু বলেন, “বাজারে সারের কোনো সংকট নেই। যে সংকট দেখানো হচ্ছে, তা অত্যন্ত ভুয়া ও মিথ্যা। তবে বিএডিসি এ ধরনের সংকট তৈরি করে থাকে। কুন্ডু ভান্ডারের স্বত্বাধিকারী তাপস কুন্ডুও বাজারে সারের সংকট ও অতিরিক্ত দাম নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, বাজারে বর্তমানে সারের কোনো সংকট নেই, অতিরিক্ত দাম নেওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না। তিনি বলেন, অনেক কৃষক আগাম সার কেনার চেষ্টা করছেন। ফলে সাময়িকভাবে চাহিদা বেড়ে গিয়ে সংকটের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তিনি জানান, তার বরাদ্দকৃত সার গত ১২ আগস্ট উত্তোলন করা হয়েছে এবং বর্তমানে টিএসপি সারের কোনো সংকট নেই। তবে ডিএপি সারের কিছুটা সংকট রয়েছে বলে তিনি স্বীকার করেন। এদিকে কৃষকদের প্রশ্ন সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে প্রতি বস্তায় ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত নেওয়া হলে সেই টাকা যাচ্ছে কোথায়? কারা এই বাড়তি দামের বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত? সারের কৃত্রিম সংকট তৈরির নেপথ্যে কারা রয়েছেতা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা। কৃষকদের অভিযোগ, কাগজে-কলমে সার বাজার মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা থাকলেও মাঠপর্যায়ে তার কার্যকর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। স্থানীয় কিছু উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ডিলারদের সঙ্গে যোগসাজশের মাধ্যমে অনিয়মে সহযোগিতা করার অভিযোগও উঠেছে। কৃষকদের দাবি, সারের বাজারে কৃত্রিম সংকট ও বাড়তি দামের অভিযোগ দ্রুত তদন্ত করে প্রকৃত কারণ বের করতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি নির্ধারিত মূল্যে পর্যাপ্ত সার সরবরাহ নিশ্চিত, অতিরিক্ত দাম আদায় বন্ধ এবং মেমো না দেওয়ার অভিযোগে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। অভিযোগের বিষয়ে শেরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফারজানা আক্তার বলেন, উপজেলায় পর্যাপ্ত পরিমাণে সার রয়েছে। বাজার নিয়ন্ত্রণে খুচরা দোকানিদের কাছে সার বিক্রি করতে নিষেধ করা হয়েছে ডিলারদের। নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি টাকা নিচ্ছেন এমন প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শেরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইদুজ্জামান হিমু বলেন, সরকারি নির্ধারিত দামের অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কোনো ডিলার অতিরিক্ত দাম নিলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শাহ জামার কামাল
শেরপুর (বগুড়া)
২৩.৮.২০২৬
০১৭১৬২৬৯৩৬৯
Bogra Sangbad সত্য সন্ধানে আমরা