

বগুড়া সংবাদ : মানব সভ্যতার অগ্রগতির এই যুগে চিকিৎসাবিজ্ঞান শরীর ও মস্তিষ্কের বহু জটিল রহস্য উন্মোচন করেছে। তবে মানুষের মন ও মানসিক স্বাস্থ্য এখনো অনেক ক্ষেত্রেই অবহেলিত এবং ভুল ধারণায় আবৃত। তেমনই একটি চরম অবহেলিত ও ভুল বোঝাবুঝির শিকার মানসিক ব্যাধি হলো ‘সিজোফ্রেনিয়া’। সমাজজুড়ে এই রোগটিকে ঘিরে রয়েছে অন্ধবিশ্বাস, ভয় এবং সামাজিক অপবাদ। এই নেতিবাচক মানসিকতা দূর করতে, জনসচেতনতা বাড়াতে এবং আক্রান্তদের অধিকার রক্ষায় প্রতি বছর ২৪ মে বিশ্বব্যাপী পালিত হয় ‘বিশ্ব সিজোফ্রেনিয়া দিবস’। দিবসটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানসিক রোগীরা সমাজের বোঝা নন, বরং সঠিক চিকিৎসা ও ভালোবাসা পেলে তারাও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন।
১. পজিটিভ বা ইতিবাচক লক্ষণ (Positive Symptoms): এগুলো হলো এমন কিছু অস্বাভাবিক আচরণ যা সুস্থ মানুষের মধ্যে থাকে না।
ডিলুশন বা বিভ্রান্তি (Delusion): এটি একটি অবাস্তব ও দৃঢ় বিশ্বাস। রোগী মনে করতে পারেন কেউ তাকে মারার ষড়যন্ত্র করছে, তার খাবারে বিষ মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে, বা কোনো অদৃশ্য শক্তি তাকে নিয়ন্ত্রণ করছে।
হ্যালুসিনেশন বা অলীক প্রত্যক্ষণ (Hallucination): বাস্তবে অস্তিত্ব নেই এমন কিছু দেখা, গন্ধ পাওয়া বা কানে অবাস্তব শব্দ বা কথা শুনতে পাওয়া। সিজোফ্রেনিয়ার রোগীরা প্রায়ই একা একা কথা বলেন, কারণ তারা মনে করেন কেউ একজন তাদের সাথে কথা বলছে।
অসংলগ্ন কথাবার্তা ও আচরণ (Disorganized Speech and Behavior): এক কথা থেকে অন্য কথায় চলে যাওয়া, প্রশ্নের অপ্রাসঙ্গিক উত্তর দেওয়া, কোনো কারণ ছাড়াই হাসা বা কাঁদা এবং সামাজিক রীতিনীতি পরিপন্থী আচরণ করা।
২. নেগেটিভ বা নেতিবাচক লক্ষণ (Negative Symptoms): এগুলো হলো মানুষের স্বাভাবিক গুণাবলী বা আচরণের অনুপস্থিতি।
আবেগহীনতা (Flat Affect): চোখের ভাষায় বা চেহারার অভিব্যক্তিতে কোনো আবেগ প্রকাশ না পাওয়া। করমর্দন বা কথা বলার সময় কোনো উৎসাহ না দেখানো।
সামাজিক বিচ্ছিন্নতা (Social Withdrawal): পরিবার, বন্ধু-বান্ধব ও সমাজ থেকে নিজেকে পুরোপুরি গুটিয়ে নেওয়া এবং একা অন্ধকার ঘরে সময় কাটানো।
আগ্রহহীনতা (Avolition): দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক কাজ যেমন— গোসল করা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা বা নিজের যত্ন নেওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলা।
৩. কগনিটিভ বা জ্ঞানীয় লক্ষণ (Cognitive Symptoms):
মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতার অভাব।
কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বা তথ্য মনে রাখার জটিলতা।
সিজোফ্রেনিয়ার সুনির্দিষ্ট কোনো একক কারণ চিকিৎসাবিজ্ঞান এখনো শতভাগ নিশ্চিত করতে পারেনি। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, এটি মূলত কয়েকটি বিষয়ের যৌথ প্রভাব:
জিনগত বা বংশগত কারণ: পরিবারে কারো এই রোগের ইতিহাস থাকলে পরবর্তী প্রজন্মের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।
মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্যহীনতা: মস্তিষ্কের নিউরোট্রান্সমিটার, বিশেষ করে ‘ডোপামিন’ (Dopamine) এবং ‘গ্লুটামেট’ (Glutamate) নামক রাসায়নিকের ভারসাম্য নষ্ট হলে এই রোগ দেখা দেয়।
পরিবেশগত ও মানসিক চাপ (Stress): অতিরিক্ত মানসিক চাপ, শৈশবের কোনো মানসিক আঘাত (Trauma), বা দীর্ঘদিন যাবৎ হতাশাগ্রস্ত জীবনযাপন এই রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
মাদকাসক্তি: অল্প বয়সে অতিরিক্ত গাঁজা, ইয়াবা, বা অন্যান্য হ্যালুসিনোজেনিক মাদক সেবন মস্তিষ্কের ক্ষতি করে সিজোফ্রেনিয়ার লক্ষণ ত্বরান্বিত করতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রায় ২ কোটি ৪০ লক্ষ মানুষ সিজোফ্রেনিয়া রোগে ভুগছেন। সাধারণত ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সের মধ্যে এই রোগের লক্ষণ প্রথম প্রকাশ পায়। পুরুষ ও নারী উভয়ের ক্ষেত্রেই এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার হার সমান। বাংলাদেশের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের এক জরিপ অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১ শতাংশ মানুষ সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত। উন্নত দেশগুলোতে রোগীরা আধুনিক চিকিৎসা পেলেও, বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সিংহভাগ রোগীই সঠিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত থাকেন।
আমাদের সমাজে সিজোফ্রেনিয়াকে এখনো একটি ‘ট্যাবু’ বা সামাজিক অপবাদ হিসেবে দেখা হয়। অজ্ঞতার কারণে গ্রামীণ ও অনেক শিক্ষিত পরিবারও একে ‘জিনে ধরা’, ‘ভূতে পাওয়া’, ‘বান মারা’ বা ‘উপছায়া’ মনে করে। ফলে রোগীকে ডাক্তারের কাছে নেওয়ার পরিবর্তে ওঝা, কবিরাজ, বা ভণ্ড পীর-ফকিরের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ঝাড়ফুঁকের নামে রোগীর ওপর চালানো হয় নির্মম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। অনেক সময় রোগীকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয় বা ঘরে বন্দী করে রাখা হয়। লোকলজ্জার ভয়ে পরিবার রোগটিকে লুকিয়ে রাখে, যার ফলে রোগী চিরতরে অন্ধকারের অতলে হারিয়ে যায়।
আধুনিক চিকিৎসা ও নিরাময় সম্ভাবনা
অনেকেই মনে করেন সিজোফ্রেনিয়া কখনো ভালো হয় না। এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের কল্যাণে সিজোফ্রেনিয়া এখন অত্যন্ত সফলভাবে নিয়ন্ত্রণযোগ্য। এর প্রধান চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো হলো:
ফার্মাকোথেরাপি (Pharmacotherapy): চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ‘অ্যান্টিসাইকোটিক’ (Antipsychotic) ওষুধ সেবনের মাধ্যমে মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা হয়। এটি চিকিৎসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সাইকোথেরাপি ও কাউন্সিলিং: কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি (CBT) এর মাধ্যমে রোগীর অবাস্তব চিন্তাগুলোকে দূর করতে সাহায্য করা হয়।
পারিবারিক ও সামাজিক পুনর্বাসন: রোগীকে সুস্থ করে তোলার জন্য পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। রোগীকে কোনো উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত করা এবং তাকে সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরি। পরিবার থেকে কটুকথা বা ‘পাগল’ জাতীয় গালি রোগীকে দেয়া যাবে না। তাকে পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে অংশীদার করতে হবে। পারিবারিক ইস্যুতে পরামর্শ বা মতামত নিতে হবে। সম্পদের ভাগ দিতে হবে।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাথমিক অবস্থায় সঠিক চিকিৎসা শুরু করলে প্রায় ২৫ শতাংশ রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন এবং ৫০ শতাংশ রোগী নিয়মিত ওষুধ সেবনের মাধ্যমে অত্যন্ত স্বাভাবিক ও কর্মক্ষম জীবনযাপন করতে পারেন। ২৪ মে বিশ্ব সিজোফ্রেনিয়া দিবস পালনের মূল লক্ষ্য হলো সমাজের প্রতিটি স্তরে সচেতনতার আলো পৌঁছে দেওয়া। এই দিনে আমাদের প্রতিজ্ঞা হওয়া উচিত:
১. কুসংস্কার বর্জন: মানসিক রোগকে শারীরিক রোগের মতোই স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে হবে এবং ওঝা-কবিরাজের কাছে না গিয়ে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের (Psychiatrist) শরণাপন্ন হতে হবে।
২. সহানুভূতিশীল আচরণ: সিজোফ্রেনিয়ার রোগীরা সাধারণত ক্ষতিকর বা হিংস্র হন না, বরং তারা নিজেরা অত্যন্ত ভয়ার্ত ও অসহায় থাকেন। তাদের উপহাস বা অবহেলা না করে ভালোবাসা ও মানসিক সমর্থন দিতে হবে।
৩. ওষুধের ধারাবাহিকতা: সিজোফ্রেনিয়ার চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি। লক্ষণ কমে গেলেও চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কখনো ওষুধ বন্ধ করা যাবে না।
৪. সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ: সরকারি পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা আরও সহজলভ্য করা, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে দক্ষ মনোরোগ বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দেওয়া এবং সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা প্রয়োজন। কমিউনিটি ক্লিনিক পর্যায় পর্যন্ত মানসিক রোগের ঔষধ বিনামূল্যে বিতরণের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
মন অসুস্থ হলে মানুষ পাগল হয়ে যায় না, ঠিক যেমন শরীর অসুস্থ হলে মানুষ অপরাধী হয় না। সিজোফ্রেনিয়া কোনো অভিশাপ, পাপের ফল বা অলৌকিক ঘটনা নয়; এটি কেবলই একটি চিকিৎসাবহুল রোগ। ২৪ মে বিশ্ব সিজোফ্রেনিয়া দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক- আমরা কুসংস্কারের অন্ধকার দূর করব, আক্রান্ত ভাই-বোনদের অবহেলার শিকল থেকে মুক্ত করব এবং সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দেব। সঠিক চিকিৎসা, সামাজিক মর্যাদা এবং পরিবারের ভালোবাসা পেলে সিজোফ্রেনিয়ার রোগীরাও এই সুন্দর পৃথিবীর আলো উপভোগ করে সম্মানের সাথে বেঁচে থাকতে পারবেন।
লেখক: মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, সিভিল সার্জন কার্যালয়, বগুড়া
Bogra Sangbad সত্য সন্ধানে আমরা