
বগুড়া সংবাদ : দীর্ঘদিনের জটিলতা ও দখলচেষ্টার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে বগুড়া শহরের স্টেশন রোড-সংলগ্ন চকবৃন্দাবন মৌজার আলোচিত রেলওয়ের প্রাকৃতিক জলাশয়টি দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে বগুড়া সিটি করপোরেশন। বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) অভিযান চালিয়ে জলাশয়ের ওপর নির্মিত অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। একই সঙ্গে পুকুরটির সীমানা নির্ধারণ ও মাটি অপসারণের কাজ শুরু হয়েছে।
জানা গেছে, প্রায় ১ একর ২৮ শতক আয়তনের এই জলাশয়টি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন জটিলতার কারণে দখল ও ভরাটের ঝুঁকিতে ছিল। জালিয়াতির মাধ্যমে সরকারি নথিতে জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে সেখানে বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের চেষ্টার অভিযোগও ওঠে।
অভিযান পরিচালনাকারী বগুড়া সিটি করপোরেশনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাঃ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সিটি করপোরেশনের পরিধি বাড়লেও নগরীতে অগ্নিকাণ্ড বা জরুরি পরিস্থিতিতে ফায়ার সার্ভিসের ব্যবহারের উপযোগী দৃশ্যমান বড় কোনো জলাশয় নেই। জনস্বার্থে জরুরি পানি সংরক্ষণ, অগ্নিকাণ্ড মোকাবিলা এবং নগরবাসীর বিনোদনের সুযোগ তৈরির লক্ষ্যেই পুকুরটি উদ্ধার করা হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, এ বিষয়ে চলমান মামলা প্রত্যাহার হয়েছে এবং আদালতের কোনো নিষেধাজ্ঞা না থাকায় ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। জলাশয়টি পুনরুদ্ধারের পর জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে উচ্ছেদ অভিযানে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট লিজগ্রহীতা ও ব্যবসায়ীরা। তাঁদের দাবি, রেলওয়ের কাছ থেকে নিয়ম মেনেই তাঁরা জমি লিজ নিয়েছেন এবং এর বিপরীতে সরকারকে বিপুল পরিমাণ রাজস্বও দিয়েছেন। তঁরা বলেন, প্রায় ৯৪ শতক জমিতে চারটি গ্রুপের প্রায় ৫০ জন ব্যবসায়ী যুক্ত রয়েছেন। ইতোমধ্যে খাজনা বাবদ প্রায় ১ কোটি ৯ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে।
লিজগ্রহীতারা বলছেন, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও শ্রেণি পরিবর্তনের প্রক্রিয়ার পর লাইসেন্স দেওয়া হলে বর্তমানে তাঁদের স্থাপনাগুলোকে অবৈধ বলা হচ্ছে কেন। একই সঙ্গে সীমানা নির্ধারণ না করেই পার্শ্ববর্তী ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে উচ্ছেদ অভিযান চালানোর অভিযোগও করেন তাঁরা।
সিটি করপোরেশনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাঃ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, জেলা প্রশাসকের অনুমোদন ছাড়া কোনো পুকুর বা প্রাকৃতিক জলাশয়ের শ্রেণি পরিবর্তনের আইনগত সুযোগ নেই। জমির শ্রেণি পরিবর্তনের জন্য যে নথি দাখিল করা হয়েছিল। তদন্তে সেটি ভুয়া ও মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। এছাড়া সংশ্লিষ্ট কোনো অবৈধ স্থাপনার জন্য সিটি করপোরেশন থেকেও অনুমোদন নেওয়া হয়নি।
বাংলাদেশ রেলওয়ের বগুড়ার কানুনগো রাজিবুজ্জামান বলেন, মূল আরএস খতিয়ানে জমিটি পুকুর শ্রেণিভুক্ত। সেই শ্রেণি অনুযায়ীই বাণিজ্যিক লিজ দেওয়া হয়েছিল ভিটা হিসেবে নয়। পরবর্তীতে জমিটির শ্রেণি পরিবর্তন করে ভিটা করার জন্য জেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করা হলেও তা নাকচ হয়ে যায়। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও প্রাকৃতিক জলাশয়ের শ্রেণি পরিবর্তনের সুযোগ নেই বলে জানানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, জামিল নগরের সাইফুল ইসলাম ও আব্দুল হাকিম সরকারসহ ১৭ জনের নামে লিজ নেওয়া চকবৃন্দাবন মৌজার ১ দশমিক ২৮ একর জমিটির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৬৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ২০২৩ সালে কৃষি লিজ নেওয়ার পর পরবর্তীতে জালিয়াতির মাধ্যমে জমিটিকে ‘ভিটা’ হিসেবে দেখিয়ে সেখানে মার্কেট নির্মাণের চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই সময় বালু ফেলে জলাশয়টি ভরাটের উদ্যোগ নেওয়া হলে পরিবেশ অধিদপ্তর ও স্থানীয় বাসিন্দাদের বাধার মুখে তা বন্ধ হয়ে যায়। জলাশয় রক্ষায় পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে একাধিকবার জেলা প্রশাসন ও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকে চিঠিও দেওয়া হয়েছিল।
বগুড়া সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এম আর ইসলাম স্বাধীন বলেন, স্টেশন রোড এলাকার ঐতিহ্যবাহী এই প্রাকৃতিক জলাশয়টি সম্পূর্ণভাবে পুনঃখনন করে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হবে। পরবর্তীতে এখানে একটি দৃষ্টিনন্দন বিনোদনকেন্দ্র ও লেক গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। নগরের পরিবেশ ও জনস্বার্থ রক্ষায় এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।